Smart News - шаблон joomla Создание сайтов
  • Font size:
  • Decrease
  • Reset
  • Increase

মেহগনির বীজ থেকে জৈব কীটনাশক ও সার উদ্ভাবন

খুলনা-মংলা মহাসড়ক ধরে আট কিলোমিটার যেতেই ভরসাপুর বাজার। এখান থেকে মংলার দিকে আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল ফিউচার অর্গানিক ফার্মের সাইনবোর্ড। ঔৎসুক্য নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ৩ জাতের ধান, ১৪ রকমের সবজি, ৬ জাতের ফল ও ৪ জাতের শাকের চাষ হচ্ছে সেখানে। উদ্যোক্তা সৈয়দ আবদুল মতিন এগিয়ে এসে জানালেন, কোনো রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন না তিনি। পোকামাকড় দমন করেন মেহগনির বীজ থেকে তৈরি তেল দিয়ে। সার হিসেবেও ব্যবহার করেন মেহগনির বীজের গুঁড়া বা কেক। আর মেহগনির পাতার নির্যাস থেকে তৈরি করেন একধরনের পানীয়। ভবিষ্যতের এই জৈব খামারে ছোট্ট একটি টিনের ঘরও চোখে পড়ল। ওটাই আবদুল মতিনের জৈব প্রযুক্তির গবেষণাগার। সেখানে ড্রামে মেহগনির তেল রাখা। বস্তায় রাখা মেহগনির বীজ থেকে তৈরি জৈব সার। বিভিন্ন বয়ামে ফসলের বীজও রাখা আছে। খুলনা শহরের তাঁর ছোট্ট বাসা থেকে প্রতিদিন বাসে করে এই খামারে আসেন সৈয়দ আবদুল মতিন। সারা দিন কাজ করে সন্ধ্যায় ফিরে যান। আবদুল মতিন জানালেন, মেহগনির বীজ ও পাতার স্বাদ নিমের মতোই তিতা। ওই তিতা স্বাদের কারণেই এত সব গুণ এর মধ্যে। রাস্তায়, বাগানে অবহেলায় পড়ে থাকা মেহগনির বীজ থেকে এত কিছু উদ্ভাবন করেই থেমে থাকেননি তিনি। দেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চারটি গবেষণা সংস্থার বিজ্ঞানীদের হাতে তাঁর উদ্ভাবন তুলে দিয়েছেন। এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করিয়েছেন। সবাই পরীক্ষা করে এর সফলতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন। শুধু গবেষণা করেই থেমে থাকেননি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই সাবেক উপসহকারী কৃষি কর্মী। মেহগনি বীজ থেকে তৈরি ওই তিনটি উদ্ভাবন রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত সংস্থা মেধাস্বত্ব, নকশা ও ট্রেডমার্ক বিভাগ থেকে পেয়েছেন মেধাস্বত্ব। ভেষজ পানীয় ও জৈব সারের স্বীকৃতি পেয়েছেন ২০১৩ সালে আর জৈব বালাইনাশকের মেধাস্বত্বের প্রাথমিক স্বীকৃতি মিলেছে এ বছর। মেহগনির বিজ নিয়ে গবেষণার আগ্রহ কেন হলো—জানতে চাইলে আবদুল মতিন স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকলেন, ‘১৯৭৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে কৃষির ওপর ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৭৮ সালের মার্চে যোগ দিলাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে। পদের নাম গ্রাম কৃষি কর্মী। গ্রামের বাড়ি রামপাল, তাই সেখানেই পোস্টিং দেওয়া হলো।’ কথা থামিয়ে আবারও জানতে চাইলাম মেহগনির প্রতি আগ্রহ কেন বা এর গুণাগুণ সম্পর্কে জানলেন কী করে? বললেন, ‘তখন রামপালে কাজ করি। ১৯৯৯ সালে একবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে গেলাম সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার ওপর একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে। সেখানে আমাকে জৈব বালাইনাশকের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। বালাইনাশক হিসেবে নিমের নানা গুণ সম্পর্কে সেখান থেকেই জানলাম।’ কিছুটা থেমে আবারও বলা শুরু করলেন, ‘কিন্তু এলাকায় এসে দেখি, নিমগাছ তেমন নেই। তাহলে কী দিয়ে হবে জৈব বালাইনাশক? একদিন পাশের গ্রামের কৃষক আবদুল গনি আরেক কৃষক মারুফের দিকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, “তুই যদি তিনটি মেহগনির বীজ খাতি পারিস, তাহলে ৫০০ টাকা পাবি।” যুবক চ্যালেঞ্জটি নিয়ে একে একে তিনটি মেহগনির বীজ চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। এরপর মুখ বিকৃত করে বমি করে দিল। পরে তাকে ধরে বাসায় দিয়ে আসলাম।’ মেহগনির বীজের তিতা স্বাদ নিমগাছের সন্ধানে থাকা মতিনকে পথ দেখাল। রামপাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের পাশের সড়কের মেহগনিগাছগুলো খেয়াল করে দেখলেন, এর পাতাগুলো স্বরূপেই আছে, কোথাও পোকায় খায়নি। ইন্টারনেটে গিয়ে গুগলে ইংরেজিতে মেহগনি ট্রি লিখে সার্চ দিতেই জানতে পারলেন, আফ্রিকা এবং পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের আদিবাসীরা এই গাছের পাতা ও বীজ দিয়ে ভেষজ ওষুধ তৈরি করে। একটি জার্নালে প্রকাশিত লেখা থেকে আবদুল মতিন জানতে পারলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার আদিবাসীরা মাথার উকুন দূর করতে মেহগনির বীজের তেল ব্যবহার করে। এ তথ্য জানতে পেরে তিনি গাছের পোকার ওপরে ওই তেল ছিটিয়ে দিয়ে দেখেন, সেগুলো মারা যাচ্ছে। বিশেষ করে ধানের ক্ষেত্রে দিয়ে দেখলেন, ক্ষতিকারক মাজরা পোকা, পাতা পোড়ানো পোকা ও বাদামি ঘাসফড়িংয়ের আক্রমণ হলো না। তবে অন্য ক্ষতিকারক পোকার ডিম খেয়ে তাদের বংশবৃদ্ধি রোধ করে এমন পোকামাকড়গুলো মারা যায়নি। বছর শেষে মতিন খেয়াল করলেন, মেহগনির তেল ছিটানো হয়েছে এমন ফসলগুলোকে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকানো গেছে। পরের বছর মেহগনি বীজের গুঁড়া গাছের গোড়ায় দিয়ে দেখলেন, অন্য সার ছাড়াই ফলন ভালো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। তাঁরা উৎসাহ দিলেন এবং পরামর্শ দিলেন আরও ফসলের ওপর এটা পরীক্ষা করার জন্য। পরে আরও খোঁজ নিয়ে আবদুল মতিন জানতে পারলেন, চীন, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, গাম্বিয়া ও নাইজেরিয়ার আদিবাসীরা মেহগনির পাতার রস জ্বর-টাইফয়েডসহ বিভিন্ন অসুখের সময় সেবন করে। আবদুল মতিনও মেহগনির পাতার নির্যাস বের করে একধরনের পানীয় তৈরি করলেন। তারপর জ্বরে আক্রান্ত মানুষকে তা খাইয়েও দেখলেন। ফলাফল সন্তাষজনক বলে তাঁর মনে হয়েছে। আবদুল মতিন জানান, সাড়ে তিন কেজি মেহগনির বীজকে ১০ লিটার পানি ও ১০ গ্রাম ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে তিন-চার দিন ভিজিয়ে রাখা হয়। বীজ নরম হলে যন্ত্র দিয়ে পিষে রস বের করেন। এতে এক লিটার তেল পাওয়া যায়। মেহগনি বীজের ছোবড়া ও বের হওয়া গাদকে তিনি সার হিসেবে ব্যবহার করেন। ২০০০ সালে মেহগনির তেল থেকে ওই বালাইনাশক তৈরির পর বিভিন্ন সময়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের লোকজন তাঁর ওই খামার পরিদর্শনে যান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সোলায়মান ফকির গবেষণা করে দেখেন, এটি ব্যবহারে ধানের পোকা নির্মূল হয়। বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের গবেষক নেসার আহমেদ গবেষণা করে দেখেছেন, মাছের রেণুতে আক্রমণকারী পোকা ও শুঁটকির পোকা দূর করার ক্ষেত্রে এই তেল কার্যকরী। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি বোর্ডের রুহুল আমীন এবং হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজাম উদ্দিন সবজির পোকা নির্মূলে এই তেলের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা ইতিবাচক ফল পেয়েছেন বলে প্রথম আলোকে জানান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক এস এস কে চৌধুরী এই তেল ইঁদুরের ওপর প্রয়োগ করে দেখেছেন, এতে ইঁদুরের কোনো শারীরিক ক্ষতি হয় না। আবদুল মতিন খেয়াল করলেন, মেহগনির তেল ছিটালে শুধু ফসলের ক্ষতিকর পোকাই দমন হয় না, মশাও বিতাড়ন হয়। এ ছাড়া মেহগনির নির্যাস খেলে গবাদিপশু তো বটেই, মানুষের শরীরে ছোটখাটো ঘা বা কেটে গেলে মেহগনির তেল দিলে তা অ্যান্টিসেপটিকের মতো কাজ করে। পিঁপড়া ও উইপোকা দমনেও মেহগনি তেলের কার্যকারিতা পেয়েছেন মতিন। আবদুল মতিন বলেন, ভারতে নিমের কার্যকারিতা নিয়ে হাজার হাজার গবেষণা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সেখানে নিমকে জনপ্রিয় করার অনেক উদ্যোগ আছে। তারা নিমের প্যাটেন্টও নিজ দেশের নামে করে নিয়েছে। আমাদের দেশে এত নিমগাছ নেই। কিন্তু কোটি কোটি মেহগনি গাছ আছে। গাছ থেকে পেড়ে আনার জন্য শ্রমিকদের মজুরি ছাড়া এর আর কোনো খরচ নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আবদুল মতিনের এই উদ্ভাবনকে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে মেহগনির তেলকে জৈব কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দুই বছর ধরে আবদুল মতিনের কাছ থেকে এই তেল নেওয়া হচ্ছে। আবদুল মতিন বলেন, মেহগনির বীজের তেল ও জৈব সারকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশবাসীকে বিষমুক্ত সবজি ও ফসল উপহার দেওয়া যাবে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বাবদ বাড়তি খরচ কমে যাবে। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি জাতীয়ভাবে এই প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে দিতে চায়, আমি আমার নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সরকারের হাতে তুলে দেব। এতে পরবর্তী প্রজন্ম বিষমুক্ত

Leave your comments

0
terms and condition.
  • No comments found
মাটি ও আবহাওয়ার কারণে মেহেরপুরের সুস্বাদু হিমসাগর আম এবারও দেশের বাইরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) ভুক্ত দেশগুলোতে রফতানি হতে যাচ্ছে।   গত বছর কীটনাশক মুক্ত আম প্রথম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করার ফলে এ অঞ্চলের আমচাষীদের মধ্যে উৎসাহ দেখা দেয়। গত বছর ১২ মেট্রিক টন আম ইউরোপিয়ান ...
আম ছাড়া মধুমাস যেন চিনি ছাড়া মিষ্টি। বছর ঘুরে এই আমের জন্য অপেক্ষায় থাকে সবাই। রসালো এ ফলের জন্য অবশ্য অপেক্ষার পালা এবার শেষ হয়েছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে আম পাড়া। এর আগে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমের রাজধানীতে এতদিন আম পাড়া বন্ধ ছিল। তাইতো ...
আমাদের দেশে উৎপাদিত মোট আমের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সংগ্রহোত্তর পর্যায়ে নষ্ট হয়। প্রধানত বোঁটা পচা ও অ্যানথ্রাকনোজ রোগের কারণে আম নষ্ট হয়। আম সংগ্রহকালীন ভাঙা বা কাটা বোঁটা থেকে কষ বেরিয়ে ফলত্বকে দৃষ্টিকটু দাগ পড়ে । ফলত্বকে নানা রকম রোগজীবাণুও লেগে থাকতে পারে এবং লেগে থাকা কষ ...
সারা দেশে যখন ‘ফরমালিন’ বিষযুক্ত আমসহ সব ধরনের ফল নিয়ে মানুষের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে, তখন বরগুনা জেলার অনেক সচেতন মানুষ বিষমুক্ত ফল খাওয়ার আশায় ভিড় জমাচ্ছেন মজিদ বিশ্বাসের আমের বাগানে। জেলার আমতলী উপজেলার আঠারগাছিয়া ইউনিয়নে শাখারিয়া-গোলবুনিয়া গ্রামে মজিদ বিশ্বাসের ২ একরের ...
এখন বৈশাখ মাস গাছে গাছে ভরা আছে মধু ফল আমে। কিন্তু মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি আম গাছে সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ডালছাড়া গাছের মধ্যখানে ধরেছে কয়েকশত আম। আর ব্যতিক্রমী ভাবে ধরা এ আম দেখেতে শিশুসহ অসংখ্য লোকের ভির হচ্ছে সেখানে। এ ঘটনাটি ঘটেছে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের ...
দেশের বাজারে নতুন হ্যান্ডসেট নিয়ে আসলো ম্যাংগো। এটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। ম্যাংগো ১১ টি মডেলের হ্যান্ডসেট নিয়ে এসেছে। এগুলোর মধ্যে ৫টি স্মার্টফোন এবং ৬ টি ফিচার ফোন। এর একটি মডেলের নাম ফজলি। এটি ফিচার ফোন। আজ রাজধানীর একটি হোটেলে ম্যাংগো অনুষ্ঠানিকভাবে ফোনগুলো অবমুক্ত করে। ...

MangoNews24.Com

আমাদের সাথেই থাকুন

facebook ফেসবৃক

টৃইটার

Rssআর এস এস

E-mail ইমেইল করুন

phone+৮৮০১৭৮১৩৪৩২৭২